• শিরোনাম

    তিতাসের মাছিমপুরে হাত বাড়ালেই ইয়াবা

    হালিম সৈকত,কুমিল্লা | বুধবার, ২১ মার্চ ২০১৮

    তিতাসের মাছিমপুরে হাত বাড়ালেই ইয়াবা

    ইয়াবা ব্যবসায়ীদের স্বর্গরাজ্য এখন কুমিল্লা জেলার তিতাস উপজেলার মাছিমপুর গ্রামটি । ইয়াবা ব্যবসায়ীদের তিতাস উপজেলার তিন-চারটি জোনের মধ্যে মাছিমপুর গ্রাম হচ্ছে এখন প্রধান জোন। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার লোকজনসহ প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে মাছিমপুর ইয়াবা,ফেনসিডিল জোন হিসেবে চিহ্নিত করে আসলেও স্থানীয় প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের কার্যক্রম রহস্য জনক।
    সম্প্রতি মাদকের অর্থ যোগাড় করতে এলাকায় প্রায়ই ডাকাতির তৎপরতা আরো বেড়ে গেছে। নেশার টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে রাতে মাছিমপুর গ্রামের তিনটি স্পটে ডাকাতির ঘটনা ঘটেই চলছে। কিন্তু এই বিষয়ে পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসন নির্বিকার। খোঁজ নিয়ে জানা যায় প্রশাসনের নাকের ডগায় মাদক ব্যবসা করে যাচ্ছে চিহ্নিত কিছু ব্যক্তি। তাদের তালিকা তিতাস থানা পুলিশের কাছে থাকলেও ধরতে পারছেন না তাদেরকে কোন রহস্যজনক কারণে। আবার কাউকে কাউকে ধরলেও টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার পুলিশ ধরে চালান দিলেও প্রভাবশালীদের শুরু হয় তদবির বাণিজ্য। জামিনে মুক্ত হয়ে আবার শুরু করে ব্যবসা। তখন আরো গতি বেড়ে যায় মাদক ব্যবসায়ীদের। স্থানীয় কিছু লোকজনের সেলটারে তারা করে চলেছে রমরমা মাদক ব্যবসা।
    যেসব স্পটে ডাকাতির ঘটনা ঘটে সেই স্পটগুলো হলো মাছিমপুর টু রায়পুর সড়কের মাছিমপুর কদমতলীর মাঝখানে ব্রিজের উপরে। মাছিমপুর টু দড়িমাছিমপুর সড়কে এবং মাছিমপুর টু মনাইরকান্দি সড়কের ব্রিজের উপরে। এই তিনটি স্পটে সব সময় কোন না কোন ডাকাতির ঘটনা ঘটেই চলছে। গত ২১ জানুয়ারি ২০১৮ খ্রি. দীপ্ত টিভির সাংবাদিক শাকিল মোল্লাসহ তার দুই বন্ধুর কাছ থেকে ২১ হাজার টাকা, তিনটি এন্ড্রায়েড মোবাইল সেট ও অন্যান্য মালামাল ছিনতাই করে নিয়ে যায় মাছিমপুর-দড়ি মাছিমপুরের সড়ক থেকে। তারা রাতে মাহফিল শুনে বাড়ি ফিরছিল। তারও আগে কলাকান্দি ইউনিয়নের যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম সরকারের আত্মীয় স্বজন ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছিল তাদের কাছ থেকে সর্বস্ব কেড়ে নেয় ডাকাত দল। যুবলীগ নেতা ইব্রাহিমের মেয়ে সড়ক দুঘর্টনায় মৃত্যুতে তারা শোক জানাতে আসছিলেন। এমন অবস্থায় তাদের কাছ থেকে সব কিছু ছিনিয়ে নেয়। এ সব করে থাকে এক দল সংঘবদ্ধ চক্র। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ডাকাতির সাথে যারা জড়িত তারা হলো জবেদ আলী (সাবেক চেয়ারম্যান ) ও মাদক স¤্রাজ্ঞী চম্পা রানীর ছেলে জয় সরকার,গরু চোর কসাই মনির, মৃত মতিন ভান্ডারীর ছেলে মামুন এবং এলাকার আরো কিছু নেশাখোর, তাদের সাথে যোগ দেয় বাইরের কিছু মাদকসেবী।
    আর তারা এসব করছে কেবল মাদকের কারণে। নেশার টাকা জোগাতেই তারা এই সব করছে।
    সূত্র জানায়, ইয়াবার বিশাল চালান আসে কুমিল্লা এবং ঢাকা থেকে। মাছিমপুর গ্রামে প্রায় ডজনখানেক পাইকারি ব্যবসায়ী রয়েছে। এদের মধ্যে চম্পা রানী (বর্তমানে সে ঢাকা থাকে), পেরু মিয়ার ছেলে আলমগীর, ১নং ওয়ার্ডের বর্তমান মেম্বার শাহজাহান (সাজা), মৃত রাজা মিয়ার ছেলে উজ্জ্বল ( মালের স্টকদার), মৃত হোসেন মিয়ার ছেলে হাফিজ মিয়া, আলী হোসেনের ছেলে জাকির হোসেন (ব্যবসা ও সেবনকারী),মোবারকের ছেলে সোহেল (মসজিদের মাইক চোর),বুইদ্দা মিয়ার ছেলে সোবহান (মাদকসেবী ও জুয়ারী), মোবারক চোরের ছেলে আবু মুছা বর্তমানে সে আসমানিয়া অবস্থান করে ব্যবসা করছে,মৃত সুবল মিয়ার ছেলে মুকবুল ও আক্তার, জুরু মিয়ার ছেলে ইব্রাহিম,আরমানের ছেলে হোসেন, কাদের মিয়ার ছেলে আজিজ (সেবনকারী),মৃত সাজুদ্দিনের ছেলে বাদল (সেবনকারী), আবিদ আলীর মেয়ে ছাফিয়া (স্টক থাকে তার কাছে), আঃ বাতেনের ছেলে মাহআলম,কানা শহীদের ছেলে আবু সাইয়্যিদ, হাসিনীর ছেলে শিপন ও শাকির (মেম্বার নির্বাচন করে হেরে ছিল) প্রমুখ।
    হাজী ফারুক ঢাকা থেকে বিয়ার, ইয়াবা, ফেনসিডিল তার ভাগিনা সাকিরের মাধ্যমে মাছিমপুর পাঠায় পাইকারি দরে। কিন্তু সে কখনো মাল নিয়ে মাছিমপুর আসে না, দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। তিতাস উপজেলা শ্রমিকলীগের নেতা গাজী পলাশ এসব তথ্য দিয়ে বলেন, এক সময় এই হাজী ফারুক টোকাই ছিল। সে তার আপন চাচাকে হত্যা করে ঢাকায় আশ্রয় নেয়। এবং মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ঢাকার বনানীতে দুটি মদের বার রয়েছে তার। মাদক বিক্রি করে শনিআখড়ায় ৫তলা বিশিষ্ট দুটি বিলাস বহুল বাড়ি করেছে এই হাজী ফারুক। এছাড়া ইয়াবার বড় ব্যবসায়ী পূর্ব পাড়ার মৃত রাজা মিয়ার ছেলে উজ্জ্বল, আলী মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন,মুসা, জুরু মিয়ার ছেলে ইব্রাহিম, সুবল মিয়ার ছেলে আক্তার, আরমান মিয়ার ছেলে হোসেন প্রমুখ।
    এদের অনেকের নামেই থানায় একাধিক মামলাও রয়েছে। তাদের নাম থানায় তালিকাভুক্ত। গত এক বছরে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফলে বর্তমানে মাছিমপুর গ্রামের আনাচে কানাচে ও পাড়া-মহল্লায় হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় ইয়াবা । মাঝে মধ্যে তিতাস থানা পুলিশ খুচরা ব্যবসায়ীদের ধরে আইনগত ব্যবস্থা নিলেও পাইকারি ব্যবসায়ীরা অধরাই রয়ে গেছে। পুলিশ কিছু কিছু ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ধরলেও টাকার বিনিময়ে আবার ছেড়ে দেবার অভিযোগও রয়েছে। তাদের কার্যক্রম সাফল্যজনক নয়। মাদক-ইয়াবা ব্যবসা বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন সুশীল সমাজসহ আপমর জনসাধারণ। তারা বলেন,ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ীদের দমনে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে।
    মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেখানে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদক ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছেন। এত নির্দেশনা থাকার পরও ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আশানুরূপ ব্যবস্থা নিতে পারছে না কেন ? মাছিমপুর গ্রামের ডজনখানেক ইয়াবা ব্যবসায়ী হঠাৎ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে। যার একেবারে কিছুই ছিল না, তারা এখন বাড়ি-গাড়ির মালিক। এ ব্যবসায় স্থানীয় ও উপজেলার কিছু প্রভাবশালী লোকজন জড়িত রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়।
    এই বিষয়ে ৫নং কলাকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি আ’লীগের সভাপতি হাবীবুল্লাহ বাহার বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান জিরো টলারেন্স। সেখানেই মাদক সেখানেই প্রতিরোধ। কোন ছাড় নয়। যারা মাদক ব্যবসা করে তাদের তালিকা আমি প্রশাসনকে প্রদান করেছি। মাদকের কারণে চুরি-ডাকাতি বেড়ে গেছে। সর্বনাশা মাদকের হাত থেকে ইউনিয়নকে বাঁচাতে হলে সকলকে এক যোগে মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে। মাদকসেবী এবং মাদক ব্যবসায়ীদের পক্ষে আমরা যেন কেউ সুপারিশ না করি।
    কুমিল্লা উত্তর জেলা আ’লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ও বিশিষ্ট সমাজ সেবক আলহাজ¦ মো. নাসির উদ্দিন বলেন, মাদক আমাদের সমাজকে গ্রাস করে ফেলেছে। প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌছে গেছে এই মরণনেশা। সুন্দর সমাজ বির্নিমাণে আমাদেরকে এর বিরুদ্ধে এখনই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। টাকার বিনিময়ে মাদক ব্যবসায়ীকে ধরে ছেড়ে দেয়া এটা কোন সভ্য সামজের রীতি হতে পারে না। পুলিশকে আরো প্রফেশনালিজমের পরিচয় দিতে হবে। মনে রাখতে হবে পুলিশ জনগনের বন্ধু। তারা ভিনগ্রহের কেউ নয়। সমাজের প্রতি তাদেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে।
    মাছিমপুর গ্রামের কৃতি সন্তান তিতাস উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ওসমান গণি ভূইয়া বলেন,আজকে যারা মাদকের ছোঁবলে আক্রান্ত হয়ে ছটপট করছে তাদেরকে দেখে অনেকে মনে করছেন কি সমস্যা? গোল্লায় যাক সমাজ,তারা কিন্তু ভূল করছেন। কারণ আগামী দিনে আপনার সন্তান যে মাদকের নেশায় নেশাগ্রস্ত হবে না তার কি গ্যারান্টি রয়েছে। মাদকসেবনকারী ও ব্যবসায়ীদের সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে,কমছে না। তাই এখনই সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
    সুশীল সমাজের সকলে মিলে আজকে থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। না হলে একদিন আমরাই মাদকের তলে পিস্ট হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ব। তিনি আরোও বলেন এই বিষয়ে পুলিশসহ প্রশাসনকে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
    মাছিমপুর টু দড়িমাছিমপুর সড়কে ডাকাতের কবলে পরা দীপ্ত টিভির কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি মো. শাকিল মোল্লা বলেন, তিতাসের এই রাস্তাটিতে ডাকাতির ঘটনা যেন নিয়মে দাড়িয়েছে। পুলিশ মাঝে সাঝে ব্যবস্থা নিলেও বন্ধ করতে পারছে না। সার্বক্ষণিক পুলিশের টহল জোরদার করতে হবে। সোর্স দিয়ে অপরাধীদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে কোন লাভ হবে না। এই অভিযানের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। তবেই মাদক ব্যবসা এবং ডাকাতির পরিমাণ কমে আসবে।
    ৩নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি ও মেম্বার মো. লিলু মিয়া বলেন, মাদক সমাজের একটি অভিশাপ। এই সর্বনাশা নেশার কবল থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে এখনই আমাদের এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তিনি পুলিশকে এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানান।
    তিতাস থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নুরুল আলম টিপু বলেন, মাদকের বিষয়ে আমরা কোন ছাড় দিব না। এই বিষয়ে আমার এবং আমাদের পুলিশ প্রশাসনের কঠোর নির্দেশ রয়েছে মাদক ব্যবসায়ীদের বিষয়ে যে বা যারা সুপারিশ করবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার। আমাদের পুলিশ প্রশাসনের কারো বিরুদ্ধে যদি কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে তাহলে তার কোন অধিকার নেই পুলিশ ডিপার্টমেন্টে চাকরি করার। আমরা তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করব। তবে হাতের পাঁচটি আঙ্গুল যেমন সমান নয়, তেমনি সব মানুষও এক নয়। তবে এই বিষয়ে কোন ছাড় নয়। পুলিশকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে তা না হলে পুলিশের একার পক্ষে মাদক মুক্ত করা সম্ভব নয়। সকলের ঐক্যবদ্ধ চেষ্টায় আমরা তিতাসকে মাদক মুক্ত করতে সক্ষম হব ইনশাল্লাহ।
    তিতাস উপজেলাসহ মাছিমপুর গ্রামবাসীর একটাই দাবী যে করেই হোক মাকদমুক্ত করতেই হবে মাছিমপুরকে। পুলিশ প্রশাসনসহ সুশীল সমাজকে এই বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে সর্বাগ্রে। অন্যথায় যুব সমাজ ধ্বংস হয়ে সমুদ্রের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হবে। কলুষিত হবে সমাজ। এখনই এর লাগাম টেনে ধরতে হবে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

  • ফেসবুকে onusondhanbd24.com